সোমবার, ৮ আগস্ট, ২০২২

গুপ্তসাম্রাজ্যের পতনের কারণ সমূহ আলােচনা কর ।

অনাস পাস ইতিহাস honours pass general history questions answers প্রশ্নোত্তর গুপ্তসাম্রাজ্যের পতনের কারণ সমূহ আলােচনা কর guptosamrajyar potoner karon somuho alochona koro questions answers


উত্তর : ( ১ ) ভূমিকা : গুপ্তবংশীয় সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র প্রথম কুমারগুপ্ত ‘ মহেন্দ্রাদিত্য ’ উপাধি গ্রহণ করে সিংহাসনে আরােহণ করেন । সম্ভবত তিনি ৪১৫ থেকে ৪৫৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন । প্রথম কুমারগুপ্ত মহেন্দ্রাদিত্যের শাসন সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না , তবে মুদ্রা ও শিলালেখ থেকে যে সব তথ্য পাওয়া যায় তা থেকে মনে হয় যে , তার সময়ে গুপ্তসাম্রাজ্যের আয়তন হ্রাস পায় নি । পূর্বদিকে উত্তরবঙ্গ থেকে পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে নর্মদা নদী পর্যন্ত এই সময় গুপ্তসাম্রাজ্যের বিস্তৃত ছিল । তিনি যে শক্তিশালী রাজা ছিলেন তা তার দ্বারা অনুষ্ঠিত অশ্বমেধ যজ্ঞের দ্বারাই প্রমাণিত হয় । তার আমলের প্রথম দিকে হূনদের আক্রমণও তিনি প্রতিরােধ করতে সমর্থ হন । প্রথম কুমারগুপ্তের রাজত্বের শেষদিকে নর্মদা অঞ্চলের পুষ্যমিত্ররা বিদ্রোহ ঘােষণা করে । যুবরাজ স্কন্দগুপ্তকেই বিদ্রোহ দমন করতে পাঠানাে হয়েছিল । স্কন্দগুপ্ত এই সঙ্কট থেকে গুপ্তসাম্রাজ্যকে রক্ষা করে সম্রাট কুমারগুপ্তের যশ ও গৌরব অক্ষুন্ন রাখেন । কুমারগুপ্তের মৃত্যুর পর স্কন্দগুপ্ত এই বিদ্রোহ সম্পূর্ণভাবে দমন করেছিলেন । 




প্রথম কুমারগুপ্তের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র স্কন্দগুপ্ত সিংহাসনে আরােহণ করেন । স্কন্দগুপ্তই গুপ্তবংশের শেষ পরাক্রান্ত সম্রাট । তিনি ৪৫৫ থেকে ৪৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন । সিংহাসনে আরােহণের পর স্কন্দগুপ্তের সর্বপ্রধান কৃতিত্ব হল হূন আক্রমণ থেকে গুপ্তসাম্রাজ্যকে রক্ষা করা । স্কন্দগুপ্ত হূনজাতিকে এমন ভাবে পরাজিত করেন যে পরবর্তী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে হূনরা আর ভারত আক্রমণ করতে সাহসী হয় নি । এই আক্রমণ থেকে গুপ্তসাম্রাজ্যকে রক্ষা করে তিনি ভারতীয় সংস্কৃতিকে বর্বর আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করেন । তবে সামরিক সাফল্যই স্কন্দগুপ্তের একমাত্র কৃতিত্ব নয় । তিনি বিশাল গুপ্ত সাম্রাজ্যের জন্য সুনিয়ন্ত্রিত শাসনব্যবস্থা প্রচলিত রাখেন । ধর্মীয় ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর উদার দৃষ্টিভঙ্গীর পরিচয় দিয়ে ছিলেন । সুদক্ষ যােদ্ধা ও সুশাসক স্কন্দগুপ্ত ছিলেন গুপ্তরাজবংশের শেষ সার্থক সম্রাট । কথাসরিৎসাগর থেকে স্কন্দগুপ্তের কার্যকলাপ জানা যায় । 





( ২ ) গুপ্তসাম্রাজ্যের পতনের কারণ সমূহ : সমুদ্রগুপ্ত দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সামরিক নৈপুণ্য ও সুদক্ষ নেতৃত্বের ফলে যে বিশাল গুপ্ত সাম্রাজ্য গড়ে ওঠেছিল খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর শেষভাগ থেকে তার পতনের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যভাগ গুপ্তসাম্রাজ্য সম্পূর্ণ ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় । প্রকৃত পক্ষে পঞ্চম শতাব্দীর শেষভাগ থেকে গুপ্তসাম্রাজ্য ক্রমে হীনবল হয়ে পড়তে থাকে এবং পৃথিবীর অন্যান্য সাম্রাজ্যগুলাের পতনের মতাে গুপ্তসাম্রাজ্যের পতনের মূলেও কোন একটি মাত্র বিশেষ কারণ ছিল না , বহুবিধ কারণের সমন্বয়ের ফলেই এই সাম্রাজ্যের পতনের কারণ প্রশস্ত হয় । স্কন্দগুপ্তই ছিলেন গুপ্তবংশের শেষ শক্তিশালী রাজা । তার পরে পুরুগুপ্ত, নরসিংহগুপ্ত , বালাদিত্য , দ্বিতীয় কুমারগুপ্ত প্রভৃতি রাজাদের  আমলে গুপ্তসাম্রাজ্যের শক্তি ও আয়তন ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তার অস্তিত্বের বিলুপ্তি ঘটে । এই সাম্রাজ্যের পতনের কয়েকটি কারণ বিশেষ ভাবে লক্ষ্য করা যায় । 


প্রথমত , অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ফলে গুপ্তসাম্রাজ্য ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়তে শুরু করে । প্রথম কুমারগুপ্তের আমলে পুষ্যমিত্র জাতির বিদ্রোহের ফলে গুপ্তসাম্রাজ্য ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়তে শুরু করে । স্কন্দগুপ্তকে বিদ্রোহী পুষ্যমিত্রদের সাময়িক ভাবে দমন করতে সমর্থ হলেও তাদের শক্তিখর্ব করা তাদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা সম্ভব হয় নি । বিভিন্ন সময়ে বিদ্রোহ করে তারা গুপ্তসাম্রাজ্যের ভিত্তিকে শিথিল করে তােলে । অপর দিকে সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে বাকাটক রাজবংশের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপিত হলেও উভয়ের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘর্ষের অবসান কখনও ঘটে নি ।গুপ্তদের দুর্বলতার সুযােগে বাকাটকগণ বারবার গুপ্তসাম্রাজ্য আক্রমণ করতে শুরু করলে চারিদিকে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় । 



দ্বিতীয়ত , অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ এবং বাকাটকদের আক্রমণে গুপ্তসাম্রাজ্য যখন ক্ষত বিক্ষত - তখনই বিদেশী হুনজাতি । এই সাম্রাজ্য আক্রমণ করতে শুরু করে । স্কন্দগুপ্তের পর দুর্বল গুপ্ত সম্রাটদের পক্ষে হূনদের আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হয় নি । মালব ও পাঞ্জাব অধিকার করে তারা মধ্যপ্রদেশের এরান জেলা পর্যন্ত অগ্রসর হয় । হূনদের আক্রমণে গুপ্তসাম্রাজ্যের সর্বত্র বিশৃঙ্খলা দেখা যায় । অনেকে মনে করেন যে হূনজাতির আক্রমণই ছিল গুপ্তদের পতনের প্রধান কারণ । 


তৃতীয়ত , অভ্যন্তরীন বিদ্রোহ ও বৈদেশিক আক্রমণের ফলে গুপ্তসাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকার ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে । এই দুর্বলতার সুযােগে সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারীরা এবং প্রাদেশিক শাসকরা নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সচেষ্ট হয়ে ওঠে । সাম্রাজ্যের অনেক অংশের শাসকগণ স্বাধীনতা ঘােষণা করেন । কনৌজের মৌখরিগণ , বলভির মৈত্ৰকগণ ও গৌড়ের শাসকগণ গুপ্তসম্রাটদের আনুগত্য অস্বীকার করেন । এই ভাবে গুপ্তসাম্রাজ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে । 



চতুর্থত , মালবদেশের শাসনকেন্দ্র মান্দায়সারের শাসনকর্তা যশােধর্মনের অভ্যুদয় গুপ্তসাম্রাজ্যের একচ্ছত্র ক্ষমতা চিরদিনের মতাে বিলুপ্ত করে দেয় । যশােধর্মন হূন দলপতি মিহিরগুলকে পরাজিত করেছিলেন এবং সম্রাট উপাধি গ্রহণ করে এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । সম্ভবত তিনি মালবের কোন সামন্ত বংশােদ্ভূত ছিলেন । মান্দাসােরে প্রাপ্ত একটি অনুশাসন থেকে জানা যায় যে যশােধর্মনের রাজ্য ব্ৰক্ষ্মপুত্র থেকে আরবসাগর এবং হিমালয় থেকে পূর্বঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । যশােধর্মনের এই রাজ্য প্রতিষ্ঠা প্রত্যক্ষভাবে গুপ্তসাম্রাজ্যের পতন সূচিত করে । 




পঞ্চমত : অযােগ্য ও দুর্বল গুপ্তরাজগণের স্বার্থপরতা ও আত্মদ্বন্দ্ব সাম্রাজ্যের পতনকে আরও সুনিশ্চিত করে তােলে । তারা আত্মকলহে লিপ্ত হয়ে সাম্রাজ্যের এক একটি অংশ আত্মসাৎ করতে চেষ্টা করেন । এমনকি তারা শক্তিশালী প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতেও শুর করেন । এর ফলে সাম্রাজ্যের শক্তিই কেবল হ্রাস পায় নি, তাদের মর্যাদাও নষ্ট হতে থাকে ।




ষষ্ঠত , গুপ্তসাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল অর্থনৈতিক সঙ্কট । অভ্যন্তরীণ গােলযােগ ও বৈদেশিক আক্রমণের ফলে সাম্রাজ্যের আর্থিক সম্পদের প্রচুর ক্ষতি হয় । ব্যবসা বাণিজ্যের সমৃদ্ধিও নষ্ট হতে শুরু করে । গুপ্তযুগের শেষ দিকে মুদ্রার অপ্রাচুর্য ও ধাতুর নিম্নমান থেকে প্রমাণিত হয় যে সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামাে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে । দেশের বিশৃঙ্খল অবস্থার সুযােগে সামন্ত রাজারাও প্রাদেশিক শাসনকর্তাগণ কেন্দ্রীয় রাজকোষে অর্থ পাঠানাে বন্ধ করে দেয় । রাজস্ব আদায়েও গাফিলতি দেখা দেয় । তাছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্যের মধ্যে যে অর্থ রাজকোষে আসত তাও বন্ধ হয়ে যায় । ঠিক এই সময়ই পশ্চিম রােম সাম্রাজ্যের পতনের ফলে গুপ্তসাম্রাজ্যের বহির্বাণিজ্যও যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয় । 



সপ্তমত , পরবর্তী গুপ্তসম্রাটদের ধর্ম ও তাদের সাম্রাজ্যের পতনের জন্য কিছু পরিমাণে দায়ী । পরবর্তী গুপ্ত সম্রাটদের মধ্যে অনেকেই বৌদ্ধধর্মের প্রতি বিশেষ ভাবে আকৃষ্ট হন । তারা সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করার দিকে কোনভাবেই আগ্রহী ছিলেন না । গুপ্তসাম্রাজ্যের পতনের জন্য সম্রাটদের এই নীতি অনেকাংশে দায়ী । সামরিক শক্তির দুর্বলতার ফলে প্রাদেশিক শাসনকর্তারও কেন্দ্রীয় সরকারকে অস্বীকার করতে সাহসী হয়ে ওঠে । চীনা পরিব্রাজক হিউ - এন - সাঙের বিবরণ থেকে জানা যায় পরবর্তী গুপ্তসম্রাটগণ দায় ও দানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন , শৌর্য বীর্যের জন্য নয় । 




( ৩ ) উপসংহার : গুপ্তসাম্রাজ্যের পতনের কারণগুলাে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ভারতের  ইতিহাসে মৌর্যসাম্রাজ্য থেকে মােগলসাম্রাজ্যের পতনের মূল কারণগুলাে একই ধরনের নেতৃত্বের দুর্বলতা , বৈদেশিক আক্রমণ , প্রাদেশিক শাসকদের বিদ্রোহ , অভিজাত শ্রেণীর ক্ষমতার লােভ এবং অর্থনৈতিক সঙ্কট । গুপ্তসাম্রাজ্যের পতনের ক্ষেত্রেও এই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম দেখা যায় নি ।




রবিবার, ৭ আগস্ট, ২০২২

মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তরিতকরণের কারণ ও ফলাফল ব্যাখা করো ।

অনাস পাস ইতিহাস honours pass general history questions answers প্রশ্নোত্তর মহম্মদ বিন তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তরিতকরণের কারণ ও ফলাফল ব্যাখা করো mahammad bin tugholker rajdhani sthanantorito koroner karon o folafol bakkha koro

উত্তর : গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র জুনা খাঁ১৩২৫ খ্রিঃ মহম্মদ বিন তুঘলক উপাধি ধারণ করে দিল্লির সিংহাসনে আরােহণ করেন । ভারতের মধ্যযুগীয় ইতিহাসে তার রাজত্বকাল ( ১৩২৫-৫১ খ্রিঃ ) একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় । তিনি তার রাজত্বকালের প্রথম কয়েক বছরের মধ্যে কতকগুলি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন । এই পরিকল্পনা গ্রহণের পশ্চাতে একাধিক কারণ উল্লেখ করা যায় । 



প্রথমত : জিয়াউদ্দিন বরণি - র মতে , দেবগিরি নগরটি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ছিল । এর ফলে এই স্থান থেকে সমগ্র ভারতের উত্তর ও দক্ষিণের রাজ্যগুলি ভালােভাবে শাসন করা যেত । 



দ্বিতীয়ত :  উত্তর - পশ্চিম সীমান্তের সন্নিকটে অবস্থিত হওয়ায় দিল্লীতে সর্বদাই মােঙ্গল আক্রমণের সম্ভাবনা ছিল । অন্যদিকে দেবগিরি সেই আশঙ্কা থেকে মুক্ত ছিল । 



তৃতীয়ত : আর্থিক দিক থেকে দক্ষিণ ভারত ছিল সমৃদ্ধশালী । দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে সরাসরি ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করে তার বিপুল সম্পদ কাজে লাগাবার উদ্দেশ্যে সেখানে একটি রাজধানী প্রতিষ্ঠার প্রয়ােজন হয় ।



 চতুর্থত :  মরক্কোর পর্যটক ইবন বতুতা বলেন যে , দিল্লীর নাগরিকরা নানা কুরুচিপূর্ণ পত্র লিখে রাতে সেগুলিকে সুলতানের দরবারে ফেলে দিত । তাই তাদের শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে সুলতান তাদের ঘর - বাড়ি ছেলে দেবগিরিতে যেতে বাধ্য করেন । 

 



উপরিউক্ত বক্তব্যের সঙ্গে আধুনিক ঐতিহাসিকরা একমত নন । ডঃ হাবিবউল্লাহ , ডঃ মহম্মদ হাবিব, ডঃ মেহেদি হােসেন , ডঃ গার্ডনার ব্রাউন প্রমুখ ঐতিহাসিক বলেন যে, দক্ষিণ ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা কম হওয়ায় সেখানে সুলতানি শাসনের ভিতর ছিল খুবই দুর্বল । এই কারণে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সুলতান দক্ষিণ ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং দিল্লী থেকে দক্ষিণ ভারতে মুসলিমদের নিয়ে যেতে চান । এছাড়া তিনি দেবগিরিকে দক্ষিণ ভারতের মুসলিম সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত করার কথা ভাবেন এবং মুসলিম সন্তদের দেবগিরিতে গিয়ে খানকা স্থাপন ও ধর্মপ্রচারের ডাক দেন ।


  

     

ফলাফল : মহম্মদ -বিন - তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তরের পরিকল্পনাটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় । এর পশ্চাতে একাধিক কারণ বিদ্যমান ছিল । 


মােঙ্গল আক্রমণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি : দিল্লী সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত হবার ফলে মােঙ্গল আক্রমণকারীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে , ফলে মােঙ্গল আক্রমণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় । 


জনগণের অসন্তোষ : অন্যদিকে দিল্লীর অধিবাসীরা এই নতুন পরিবেশে নিজেদেরকে খাপ খাওয়াতে না পেরে ক্রমেই অসন্তুষ্টহয়ে উঠতে থাকে । 


সুলতানের নির্দেশ : শেষে সুলতান তার ভুল বুঝতে পেরে পুনরায় সকলকে দিল্লীতে প্রত্যাবর্তনের আদেশ দেন । তিনি যদি কেবলমাত্র সরকারি দপ্তরসমূহ স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতেন তাহলে হয়তাে তার এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হতাে না । এইজন্য ঐতিহাসিক স্ট্যানলি লেনপুল মন্তব্য করেন - “Daulatabad remained a monument of misdirected energy” .




শনিবার, ৬ আগস্ট, ২০২২

বিজয়নগর ও বামনী সাম্রাজ্যের সংঘর্ষের কারণ আলােচনা করাে ।

অনাস পাস ইতিহাস honours pass general history questions answers প্রশ্নোত্তর বিজয়নগর ও বামনী সাম্রাজ্যের সংঘর্ষের কারণ আলােচনা করাে bijaynagar o bamoni samrajyar songhosher karon alochona koro


উত্তর : ১৩৩৬ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যে বিজয়নগর নামে একটি শক্তিশালী হিন্দুরাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে তা বিশাল আয়তন রাজ্যে স্ফীত হয়েছিল । উত্তর দিকে বিজয়নগরের রাজাদের যে শত্রুর মােকাবিলা করতে হয়েছিল তার নাম বাহমনী রাজ্যে । বাহমনী রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৩৪৭ খ্রিস্টাব্দে । আলাউদ্দিন বাহমান শাহ ছিলেন বামনী রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ।নানা কারণে হিন্দু শাসিত বিজয়নগর ও মুসলিম শাসিত বাহমনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলেছিল । এই সংঘর্যের কারণগুলি হল – 
 

ধর্মীয় বিদ্বেষ : বুক্ক-রসময় থেকে বাহমনী রাজ্যের সাথে দীর্ঘ সংগ্রামের সূচনা হয় । রাজ্যের উত্তরদিকে মুসলমান শাসিত বামনী রাজ্য ছিল বিজয়নগরের সবচেয়ে প্রদ্বিন্দ্বী । ১৩৪৭ খ্রিস্টাব্দে আফগান সৈনিক আলাউদ্দিন হাসান শাহ কর্তৃক বাহমনী রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ঘটে । যাইহােক , মুসলমান শাসিত বাহমনী রাজ্যের সাথে হিন্দু শাসিত বিজয়নগর রাজ্যের সংঘাত ছিল ইতিহাসের অনিবার্যপরিণতি । 


দাক্ষিণাত্যে রাজনৈতিক প্রাধান্য অর্জন : তবে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিদ্বেষ এই দুই দক্ষিণী রাজ্যের দীর্ঘ সংগ্রামের একমাত্র কারণ ছিল না । আসলে এই সংঘর্ষের আপাত লক্ষ্য ছিল দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক প্রাধান্য অর্জন । তবে সেই লক্ষ্য গভীর অর্থনৈতিক প্রয়ােজন দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল । তুঙ্গভদ্রা , দোয়াব, কৃষ্ণা, গােদাবরী ব-দ্বীপ ও মারাঠা রাজ্যে এই সুনির্দিষ্ট তিনটি অঞ্চলের উপর কর্তৃত্ব স্থাপনের সাথে অর্থনৈতিক লাভ - ক্ষতির প্রশ্ন বিশেষভাবে জড়িত ছিল । 

হরিহরের সিংহাসন আরােহণ : বুকের মৃত্যুর পর তার পুত্র হরিহর মহারাজাধিরাজ উপাধি ধারণ করে সিংহাসন আরােহন করেন । যােদ্ধা হিসাবে খ্যাত দ্বিতীয় হরিহর মাদুরাই দখল করে পূর্ব উপকূলের দিকে রাজ্য বিস্তারে মন দেন । এই অংশে কয়েকটি হিন্দু রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল । যার মধ্যে রেস্তিরা , বরঙ্গল রাজ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ । তবে বরঙ্গল রাজ্যের সাথে বাহমনী সুলতানের মিত্রতার ফলে হরিহরের ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি । 


উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিরােধ : দ্বিতীয় হরিহরের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যে বিরােধ দেখা দিয়েছিল প্রথম দেবরায় দ্বিতীয় বুক্ককে ক্ষমতাচ্যুত করে সেই বিরােধের নিরসন করেন । তার আমলে বাহমনী রাজ্যের সাথে বিজয়নগরের পুনরায় সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে । তারপর বেশ কয়েকবার বিজয়নগর ও বাহমনী রাজ্যের বিরােধ ঘটে । 

উপরিউক্ত নানা কারণে বিজয়নগর ও বাহমনী সাম্রাজ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত । 





শুক্রবার, ৫ আগস্ট, ২০২২

বাহমনী রাজ্যের ইতিহাসে মামুদ গাওয়ানের অবদান আলােচনা করাে ।


অনাস পাস ইতিহাস honours pass general history questions answers প্রশ্নোত্তর বাহমনী রাজ্যের ইতিহাসে মামুদ গাওয়ানের অবদান আলােচনা করাে bahomoni rajyar itihase mamud gaoyaner abodan alochona koro

উত্তর : সূচনা : মামুদ গাওয়ান ১৪৬৪ - ১৪৮১ খ্রিস্টাব্দে এই সময় মামুদ গাওয়ান নামে জনৈক ‘পরদেশী’ রাজ্যের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন । তিনি কেবলমাত্র বাহমনী রাজ্যকে আশু ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষাই করেন নি , সব দিক থেকে রাজ্যটিকে শক্তিশালী করে গড়ে তােলেন । সৎ ও নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী গাওয়ানের বিচক্ষণতা , দূরদর্শিতা, কূট কৌশল , সমর কুশলতা ও প্রশাসনিক দক্ষতায় বাহমনী রাজ্যে উন্নতির চরম শিখরে আরােহন করে । 


ক্ষমতালাভ : ১৪৬১ খ্রিস্টাব্দে সুলতান হুমায়ুন শাহের মৃত্যু ঘটলে তার নাবালক পুত্র নিজাম শাহ সিংহসনে বসেন । এ সময় প্রকৃত শাসনক্ষমতা ছিল রাজামাতা মকদুমা জাহানা -র হাতে । তিনি খাজা জাহান এবং মামুদ গাওয়ান নামক দুইজন ওমরাহের সাহায্যে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন । নিজাম শাহের মৃত্যুর পর ( ১৪৬৩ খ্রিস্টাব্দে ) সিংহাসনে বসেন ছয় বৎসর বয়স্ক বালক তৃতীয় মহম্মদ শাহ । ১৪৬৫ খ্রিস্টাব্দে খাজা জাহানের মৃত্যু হয় এবং রাজমাতা সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান । এর ফলে মামুদ গাওয়ানের উপর রাজ্যের সকল দায়িত্ব অর্পিত হয় । তিনি ‘উজির’ পদে নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু তিনি এই পদে বহাল থেকে কার্যত বাহমনী রাজ্যের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন । 


রাজ্যজয় : তিনি পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলির বহু অংশ জয় করে বাহমনী রাজ্যের সম্প্রসারণ ঘটান । তিনি বিজয়নগর রাজ্য আক্রমণ করে দাভোল ও গােয়া সহ পশ্চিম উপকূলের বিশাল এলাকা ও পূর্ব উপকূলের রাজমুন্দ্রি ও কোন্দাভির দখল করেন । পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলি হস্তচ্যুত হওয়ায় বিজয়নগর রাজ্যের প্রবল ক্ষতি হয় । অপরদিকে ইরাক , ইরান , প্রভৃতি দেশের সঙ্গে বামনী রাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য প্রসারিত হয় । এছাড়া পশ্চিম এশীয় বাণিজ্যের ফলে অন্তর্দেশীয় বানিজ্য ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায় । এই সময় বাহমনী সেনাদল বিজয়নগরের অভ্যন্তরে কাঞ্চি বা কাঞ্চিভরম পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে যথেচ্ছভাবে নগরটি লুণ্ঠন করে । তিনি সঙ্গমেশ্বর রাজ্য আক্রমণ করে খালনা দুর্গটি দখল করেন । তিনি উড়িষ্যার বিরুদ্ধে অভিযান পাঠিয়ে জয়যুক্ত হন এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসাবে তিনি উড়িষ্যা রাজ্যের কাছ থেকে বহু ধনরত্ন ও হাতি আদায় করেন । সুলতান আহম্মদ শাহের আমল থেকে খলজি শাসিত মালবের সঙ্গে বাহমনী রাজ্যের বিবাদ চলছিল । মামুদ গাওয়ান মালবের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে সফল হন । 


প্রশাসনিক সংস্কার : সুশাসক মামুদ গাওয়ান প্রশাসনে নানাবিধ সংস্কার প্রবর্তন করেন । তিনি  প্রশাসনে দুর্নীতি বন্ধ করেন এবং সরকারী কর্মচারীদের উৎকোচ গ্রহণ নিষিদ্ধ করেন । তিনি বিচার বিভাগ ও রাজস্ব বিভাগেও সংস্কার প্রবর্তন করেন । তিনি রাজ্যের সকল জমি জরিপ করে ভােগ দখলকারীদের তালিকা প্রস্তুত করেন । ভূমি সংস্কারের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযােগ্য । তিনি কর্মচারীদের দায়িত্ব ও বেতন নির্ধারণ করে দেন । পূর্বে বাহমনী রাজ্যে চারটি তরফ বা প্রদেশ ছিল । তিনি তরফ এর সংখ্যা করেন আটটি । তিনি প্রয়ােজনে হিন্দুদের উচ্চ রাজপদে নিয়ােগ করতেন ।এ সময় ‘দক্ষিণী’ ও ‘পরদেশী ’ মুসলিমদের বিবাদ তীব্র আকার ধারণ করলে তিনি উভয় পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার নীতি গ্রহণ করেন । 


বিদ্যার পৃষ্ঠপােষক : তিনি সৎ ও নির্মল চরিত্রের মানুষ ছিলেন । তাঁর জীবন ছিল অনাড়ম্বর । তিনি বিদ্যা ও বিদ্বানের পৃষ্ঠপােষক ছিলেন । তিনি নিজে গণিত ও চিকিৎসা শাস্ত্রের উৎসাহী ছাত্র ছিলেন । তিনি বিদরে একটি বিশাল মাদ্রাসা নির্মাণ করেন ।প্রায় এক হাজার ছাত্র ও শিক্ষক এখানে অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা করতেন । এখানে পড়াশােনা , আহার ও বসবাস করার জন্য কোনাে খরচ দিতে হতাে না । দেশ বিদেশের পণ্ডিতরা এখানে সমবেত হতেন । 





মামুদ গাওয়ানের প্রাণদণ্ড : মামুদ গাওয়ানের প্রতিপত্তি বৃদ্ধিতে অনেকে ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠেন ।   মামুদ গাওয়ান বিরােধী ‘দক্ষিণী’গােষ্ঠী একটি জাল দলিল তৈরি করে তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার  অভিযােগ এনে সুলতান তৃতীয় মহম্মদ শাহের কাছে পেশ করে । কোনাে প্রকার অনুসন্ধান না করেই সুলতান তার মৃত্যুদণ্ড দেন । ঐতিহাসিক টেলর বলেন যে , তাঁর মৃত্যুতে বামনী রাজ্যের সকল সংহতি ও ঐক্য বিনষ্ট হয় । 




বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০২২

ভারতের ইতিহাসে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দের গুরুত্ব আলােচনা করাে ।

অনাস পাস ইতিহাস honours pass general history questions answers প্রশ্নোত্তর ভারতের ইতিহাসে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দের গুরুত্ব আলােচনা করাে bharoter itihase 1526 khirstabder gurutto alochona koro


উত্তর : পানিপথের প্রথম যুদ্ধে আফগান সুলতান ইব্রাহিম লােদির পরাজয় ও মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তিনশাে বছরের অধিককাল ব্যাপী দিল্লির সুলতানি শাসনের উচ্ছেদ হয় । এই যুদ্ধে জয়ের ফলে বাবরের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয় মােঘল সাম্রাজ্য । 

পানিপথের জয়ের পর বাবর ভারতে স্থায়ীভাবে রাজত্ব করার প্রবণতা প্রকাশ করেন । রাজপুত নেতারানা সংগ্রাম সিংহের সঙ্গে সংঘর্ষে জয়লাভ করে উত্তর ভারতে তার শক্তি প্রাধান্য সৃষ্টি করে এবং তিনি ‘বাদশাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন । এই বাদশাহী রাজত্বে সুলতানী যুগের ন্যায় ধর্মতত্ত্বের খাতিরে বাগদাদের খলিফার অধীনে শাসককে রাখার প্রথা বিলুপ্ত হয় । এভাবে মােঘল রাষ্ট্রে শাসক এক উচ্চ পদমর্যাদার অধিকারী হয়ে ওঠেন । 

তবে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের জয়ের ফলে বাবর সাম্রাজ্য স্থাপনে প্রথম পদক্ষেপ ঘটান মাত্র । কারণ , তখনও আফগান উপজাতিক বিরােধিতা যথেষ্ট পরিমাণে বজায় ছিল এবং রাজপুত জাতির বিরুদ্ধাচারণও নেহাত অল্প ছিল না । তাই বলা যায় যে , পানিপথের যুদ্ধ চূড়ান্ত বিজয় ছিল না ।সাম্রাজ্য তখনও ছিল অনেক দূর । তাই একে প্রথম সােপান হিসাবে গণ্য করাই যুক্তিযুক্ত হবে । 


পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর কর্তৃক নিয়ােজিত আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ভারতীয় সামরিক জগতে এক নতুন যুগের সন্ধান দিয়েছিল । কামান ও গােলন্দাজ আক্রমণের মুখে প্রাচীন ভারতের যুদ্ধ - কৌশল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় অতি সহজেই । এরপর থেকেই কামান ও বারুদের ব্যবহার সম্পর্কে ভারতীয় যুদ্ধ - কুশলীরা শিক্ষা নিতে যত্নবান হয়ে ওঠেন । 


বাবর ছিলেন মধ্য এশিয়ার বিখ্যাত বীর তৈমুর লঙের বংশধর । বলা বাহুল্য, বাবর কর্তৃক ভারতে মােঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হলে ভারতের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার এক অভিনব রাজনৈতিক যােগসূত্র গড়ে ওঠে । মােঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার পর থেকে কাবুল ও কান্দাহার ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রের অন্তর্গত হয়ে পড়ে । তার ফলে ভারতের রাজনীতিতে মধ্য এশিয়ার প্রভাব পড়ে । মধ্য এশিয়ার তুর্কি, পারসিক , উজবেকী প্রভৃতি সম্প্রদায়ের সমরকৌশল ভারতে পৌছাতে আরম্ভ করে । 


মােঘল সাম্রাজ্য ভারতকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উদারতা দিয়েও উপকৃত করেছিল । বাবরের ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের বিজয় বিভিন্ন অর্থে গুরুত্বপূর্ণ এবং এর ফলাফল প্রদর্শিত হয় ভারতীয়দের জাতীয় জীবনের বিবিধ স্তরে । তাই প্রকৃত অর্থে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ।

 


বুধবার, ৩ আগস্ট, ২০২২

দাসবংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে কুতুবউদ্দিন আইবকের কৃতিত্ব আলােচনা কর ।

অনাস পাস ইতিহাস honours pass general history questions answers প্রশ্নোত্তর দাসবংশের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে কুতুবউদ্দিন আইবকের কৃতিত্ব আলােচনা কর dasbongsher protisthata hisabe kutubuddin aibker krititto alochona koro


উত্তর : ১২০৬ খ্রিঃ মহম্মদ ঘুরির মৃত্যু হলে তার শাসনভার গ্রহণ করেন তার কর্মচারী কুতুবউদ্দিন আইবক । ১২০৮ খ্রিঃ তিনি দিল্লির স্বাধীন শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন । তার শাসনকাল স্বল্পস্থায়ী হলেও ঘুরির আধিপত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে তিনি দিল্লীতে স্বাধীন সুলতানী শাসনব্যবস্থা স্থাপন করেন । 

ঘুরির মৃত্যুর পর কুতুবউদ্দিন লাহাের যাত্রা করেন এবং লাহােরের নাগরিকদের সমর্থন করেন । উত্তর পশ্চিম সীমান্তের প্রতিদ্বন্দ্বী তাজউদ্দিনকে প্রতিহত করার পর কুতুবউদ্দিন তাঁর পূর্ব সীমান্তে , বাংলার দিকে দৃষ্টি দেন । বাংলায় বকতিয়ার খলজি নিহত হবার পর কুতুবউদ্দিন পরােক্ষ ও প্রত্যক্ষ হস্তে আলিমদান শাসনের সূচনা করেন । বাংলায় দিল্লীর অধীনে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয় । 

কুতুবউদ্দিন আইবক সুলতানী সাম্রাজ্যের বিস্তার অপেক্ষা নিরাপত্তা ও সংগঠনে বেশী নজর দেন ।তিনি রাজপুত শক্তিকে সম্পূর্ণ জয় করার দিক থেকে বিরত থাকেন । তুর্কী ও আমিরদের তিনি বশ্যতায় এনে দিল্লীর সুলতানীর ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করেন । তার প্রধান কৃতিত্ব ছিল গজনীর তাজউদ্দিনের আগ্রাসনের হাত থেকে দিল্লীর সুলতানীকে রক্ষা করা । তিনি গজনীর মত মধ্য এশিয়ার রাজনীতিতে দিল্লীকে না জড়িয়ে দিল্লীর সুলতানীকে ভারতীয় চরিত্র দেন । তিনি দিল্লীতে রাজধানী স্থাপন করে সুলতানী সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত অগ্রগতির সূচনা করেন । 

কুতুবউদ্দিনকে দিল্লীর স্বাধীন সুলতান হিসেবে মেনে নিতে অনেকের মতবিরােধ আছে । ডঃ আর.পি. ত্রিপাঠী মনে করেন কুতুবউদ্দিন আইবককে দিল্লীর স্বাধীন সার্বভৌম সম্রাট বলা যায় না । 

তবে দিল্লীর সুলতানীর প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে কুতুবউদ্দিনের নাম নস্যাৎ করা যায় না । কারণ তিনি সর্বপ্রথম গজনীর কৃতিত্ব অস্বীকার করে দিল্লীর স্বাধীনতা ঘােষণা করেন । আবার ঘুরির মৃত্যুর পর যখন ভারতে বিস্তৃত সাম্রাজ্য ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয় তখন কর্মচারীরা তাদের উচ্চ আকাঙ্ক্ষা বশত স্বাধীনতা ঘােষণার উদ্যোগ নেয়  , তখন কুতুবউদ্দিন তাদের দমন করে ভারতে তুর্কী সাম্রাজ্য রক্ষা করেন । 

১২০৬ - ১২১০ খ্রিঃ পর্যন্ত স্বাধীন রাজত্বকালে চার বছর কুতুবউদ্দিন প্রথমত উত্তর পশ্চিম সীমান্ত নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন । মহম্মদ ঘুরীর উত্তরসুরীদের ভারত আক্রমণের চেষ্টা রুখতে সীমান্ত নিকটবর্তী লাহােরে ঘাঁটি স্থাপন করেন । ১২১০ খ্রিঃ লাহােরেই তার মৃত্যু হয় । নতুন রাজ্যজয় কিংবা শাসন সংগঠন সংক্ষিপ্ত রাজত্বকালে কোনাে দিকেই তিনি মন দিতে পারেননি । তার সেরা কৃতিত্ব দিল্লীকে কেন্দ্র করে মধ্য এশিয়ার প্রভাবমুক্ত একটি সার্বভৌম শক্তির ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা ।


মঙ্গলবার, ২ আগস্ট, ২০২২

দিল্লির প্রথম সুলতানী শাসনকে ‘দাসবংশ’ নামে চিহ্নিত করা কতদূর যুক্তিসঙ্গত ?

অনাস পাস ইতিহাস honours pass general history questions answers প্রশ্নোত্তর দিল্লির প্রথম সুলতানী শাসনকে দাসবংশ নামে চিহ্নিত করা কতদূর যুক্তিসঙ্গত delhir prothom sultani sashonke dasbongsho name chinhito kora kotodur juktisongoto


উত্তর : কুতুবউদ্দিনের দ্বারা স্থাপিত বংশের অধিকাংশ শক্তিশালী সম্রাটরাই প্রথম জীবনে ছিলেন ক্রীতদাস । যেমন মহম্মদ ঘুরীর ক্রীতদাস ছিলেন কুতুবউদ্দিন আইবক , আবার ইলতুৎমিস , বলবনও ছিলেন ক্রীতদাস । এমফিলস্টোন , স্মিথ প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ এদের বংশকে দাসবংশ বা ‘Slave Dynasty’ বলে উল্লেখ করেছেন । 

কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকরা এদের দাসবংশ বলে অভিহিত করাকে ঐতিহাসিক দিক থেকে অযৌক্তিক বলে মনে করে । ডঃ ঈশ্বরী প্রসাদের মতে , “A slave king according & to Islamik law would be a contradiction terms” কারণ তিনটি রাজবংশ এই সময়ে রাজত্ব করেছিল । পৃথক পৃথক ব্যক্তি এই তিন রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা । তাছাড়া এরা জীবনের প্রারম্ভিককালে ক্রীতদাস হিসাবে জীবন আরম্ভ করলেও প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রেই প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন এবং যখন তারা সিংহাসনে আরােহণ করেছিলেন তখন তারা স্বাধীন নাগরিক ছিলেন । ইলতুৎমিস ও বলবন দুজনেই সিংহাসন আরােহণের পূর্বেই প্রভু কর্তৃক দাসত্ব থেকে মুক্তি পান । কুতুবউদ্দিন আইবক সম্ভবত সিংহাসনে আরােহণের পরে দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ করেন । 


আবার অধ্যাপক সতীশচন্দ্র , নিজামি প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ সবদিক থেকে বিচার করে এদেরকে মামেলুক বলে অভিহিত করেছেন । মামেলুক শব্দটি আরবি শব্দ । যার অর্থ ‘স্বীয়’ অধিকার ভুক্ত । গৃহকর্মে বা অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে নিযুক্ত সাধারণ ক্রীতদাসদের সঙ্গে পার্থক্য করার জন্যই প্রধানত সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত তুর্কী ক্রীতদাস অর্থে শব্দটি ব্যবহার হত ।



অনেকে আবার এদেরকে ইলবারী বা আলবারী তুর্কী বলে উল্লেখ করেছেন । কুতুবউদ্দিন আইবক ‘ইলবারী’ গােষ্ঠীভুক্ত তুর্কী ছিলেন না । ইলতুৎমিসের সময় থেকে ১২৯০ খ্রিঃ পর্যন্ত ইলবারি - র তুর্কি সুলতানরা দিল্লীতে ক্ষমতাসীন ছিলেন । সুতরাং ১২০৬ - ১২৯০ কালপর্বের সুলতানদের ‘ইলবারি তুর্কি’ বলা সঠিক নয় । 

তবে এই গােষ্ঠীর সকল সুলতান ইলবারীর বংশভূত / গােষ্ঠীভুক্ত ছিলেন না । সুতরাং যৌথভাবে এই গােষ্ঠীর সকলকেই রাজগােষ্ঠী বা রাজবৃত্ত বলাই যুক্তিযুক্ত । তাছাড়া কুতুবউদ্দিন , ইলতুৎমিস এবং বলবন ছাড়া এই গােষ্ঠীর অন্য কোনাে সুলতান ক্রীতদাস ছিলেন না । আবার উক্ত তিনজন একই বংশের ব্যক্তি ছিলেন না । তাই এই তিনজনের প্রতিষ্ঠিত বংশকে যথাক্রমে কুতুবী , ইলসামসীতুৎমিস এবং বলবনী বংশ নামে অভিহিত করা অযৌক্তিক নয় । কিন্তু উক্ত তিনজন সুলতান পরস্পর বৈবাহিক সূত্রে গােষ্ঠীভুক্ত ছিলেন । যেমন দাস সুলতান কুতুবউদ্দিনের জামাতা ছিলেন ক্রীতদাস ইলতুৎমিস । ক্রীতদাস বলবন ছিলেন ইলতুৎমিসের জামাতা । তাই অনেক ঐতিহাসিক তিনজনকে একত্রিত করে যৌথভাবে দাসবংশ বা দাস রাজগােষ্ঠীর আখ্যা দিতে চান । ডঃ মাখনলাল রায়চৌধুরীর মতাে ঐতিহাসিকও দিল্লীর প্রথম সুলতানী শাসনকে দাসবংশ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন ।