সমাজে নারীর স্থান বিশেষ ভাবে উল্লেখ করে ঋকবৈদিক যুগের সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে লেখো ।

অনাস পাস ইতিহাস honours pass general history questions answers প্রশ্নোত্তর সমাজে নারীর স্থান বিশেষ ভাবে উল্লেখ করে ঋকবৈদিক যুগের সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে লেখো somaje narir sthan bisesh vabe ullekh kore rikboidik juger somajbabostha somporke lekho


উত্তর : ( ১ ) একান্নবর্তী পরিবার : ঋকবেদের যুগে সমাজ বিন্যাস ক্রমশ জটিল হয়ে উঠতে শুরু করে । তবে এই যুগে যেমন রাষ্ট্রের তেমন সমাজের ভিত্তি ছিল পরিবার । পরিবার ছিল একান্নবর্তী এবং পরিবারের লােকের একই বাড়ীতে বাস করত । ঋকবেদের যুগে আর্যর গ্রামে ও নগরে বাস করত । ঋকবৈদিক যুগের আর্যরা সাধারণত কাঠের তৈরি বাড়ীতে বসে করত । প্রতি বাড়ীতে অগ্নিশালা এবং বাইরের ও মেয়েদের জন্য আলাদা ঘর থাকত । পরিবারের কর্তাকে গৃহপতি বা দম্পতী বলা হত । পরিবারটিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার দায়িত্ব তিনি বহন করতেন । 



( ২ ) সমাজে নারীর স্থান : পরিবার পিতৃতান্ত্রিক ছিল বলে স্বাভাবিক ভাবে সকলেই পুত্রের জন্ম কামনা করত । স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রীতিভাব গার্হস্থ্য ও আধ্যাত্মিক কর্মে পরস্পর পরস্পরের প্রতি সহায়ত এবং পুত্র উৎপাদনের দ্বারা বংশ রক্ষা করা এই সমস্তই ছিল বিবাহ বন্ধনের মূখ্য উদ্দেশ্য । অপুত্রক আর্যগণ পারলৌকিক ক্রিয়াকলাপ সম্পন্ন করার জন্য দত্তক পুত্র ও ক্ষেত্রজপুত্র লালন - পালনের পক্ষপাতী হলেও কন্যা সন্তানকে কখনও অবহেলা করা হতনা । প্রকৃতপক্ষে ঋকবৈদিক যুগে নারীগণ সমাজে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করতেন । যে যুগে নারী ও পুরুষের মধ্যে সমাজগত অধিকারের কোন পার্থক্য ছিলনা । পুরুষদের মতাে নারীরাও উপযুক্ত ভাবে বিদ্যাচর্চা করার সুযােগলাভ করতেন । বৈদিক যুগে পুরুষদের শিক্ষা সম্পর্কে সুস্পষ্ট আলােচনা থাকলেও নারীদের শিক্ষা সম্পর্কে এইরূপ কোন আলােচনা পাওয়া যায় না । তবে সে যুগে নারীরা যে শিক্ষা লাভ করার সুযােগ পেতেন ঋকবেদে তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় । ব্রাত্মণ , ক্ষত্রিয় ও  বৈশ্য এই তিনটি উচ্চ শ্রেণীর নারীরা বেদ অধ্যয়নেরও সুযোগ পেতেন । নারীরা অধ্যাপনা করতেন এবং কেউ যজ্ঞস্থলে ঋত্বিকের কাজও করতেন । ঋকবেদে মন্ত্রদ্রষ্টা অনেক নারীর নাম পাওয়া যায় । তাদের মধ্যে বিশ্ববারা, রােমশা , লােপামুদ্রা, পৌলােমী , ঘােষা , জয়িতা , শ্রদ্ধা  কামায়নী প্রভৃতির নাম উল্লেখযােগ্য । ঋকবেদের সংবাদ সূক্তে উর্বশী , যমী , সর্পরাজ্ঞী ও ইন্দ্রানী প্রভৃতিকে অংশ গ্রহণ করতে দেখা যায় । 

মেয়েরা বয়স্কা হলে তাদের বিবাহ দেওয়া হত । সমাজে বাল্যবিবাহের প্রচলন ছিল না । সেই যুগে আর্যগণ বিবাহকে অতি পবিত্র এবং প্রয়ােজনীয় কর্ম হিসাবে গণ্য করতেন । এক হৃদয়ের সঙ্গে অপর হৃদয়ের মিলনের জন্য শাস্ত্রসম্মত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রচলন ছিল । সে যুগে বিবাহিতানারী সপত্নী দ্বারা যে পীড়িতা হতেন এবং দেবতার কাছে সপত্নীর মৃত্যু যে কামনা করতেন ঋকবেদে তারও প্রমাণ পাওয়া যায় । তবে ঋকবেদের যুগে নারীদের একাধিক বিবাহের প্রচলিত না থাকলেও তা একেবারে অপ্রচলিত ছিল না । সে যুগে বিধবা বিবাহও একেবারে অপ্রচলিত ছিল না । ঋকবেদের যুগে পুরুষের একাধিক বিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল । 


ঋকবেদের যুগে মেয়েদের জন্য কোন পর্দা প্রথা ছিল না । কিন্তু আইনের চোখে তারা সমান অধিকার ভােগ করতেন না । এক্ষেত্রে তাদের পুরুষ আত্নীয়দের ওপর নির্ভর করতে হত । ঋকবেদের যুগে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল কিনা সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোন ধারনা লাভ করা যায় না । সম্ভবত একমাত্র রাজন্যবর্গের পরিবারের মধ্যেই এই প্রথা সীমাবদ্ধ ছিল । 


( ৩ ) বর্ণ ও আশ্রম ব্যবস্থা : ঋকসংহিতায় সেই সময় প্রচলিত বর্ণ ব্যবস্থার যা সম্পর্কে পন্ডিতগণ বিভিন্ন মত পােষণ করেন । তবে বর্ণপ্রথার পরােক্ষ উল্লেখ থেকে সমাজে বর্ণপ্রথার প্রচলন ছিল তা প্রমাণিত হয় । ঋকমন্ডলের দশম মন্ডলের পুরুষসূক্ত থেকে জানা যায় যে সৃষ্টিকর্তা পরমপুরুষের মুখ ব্রাত্মণে পরিণত হল , বাহুদ্বয় ক্ষত্রিয় হল উরুদ্বয় থেকে বৈশ্যের উৎপত্তি হল এবং পদযুগল থেকে শূদ্র উৎপন্ন হল । এই ভাবে চারিবর্ণে সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়ে । 


ঋকবেদের অন্যত্র সমাজের দুটি মূলভাগ দেখতে পাওয়া যায় — আর্য ও দাস । বিজয়ী আর্যদের কাছে পরাজিত অনার্যজাতি দাসে পরিণত হয় । মনে হয় এই প্রথা জাতিভিত্তিক ছিল । পরে দাস জাতি সমাজের অঙ্গীভূত হয়ে গেলে তারা শূদ্র বলে অভিহিত হয় । তবে বৃত্তি বা পেশা হিসাবেই যে বর্ণ বিভাগের ব্যবস্থা তা সহজেই অনুমান করা যায়। ব্রাত্মণ বিদ্যাচর্চা করত বলে মুখ থেকে তার উৎপত্তি , ক্ষত্রিয় শান্তিরক্ষা করত বলে বাহুদ্বয় থেকে তার উৎপত্তি , বৈশ্য অর্থনৈতিক বিন্যাসকে সংরক্ষণ করত বলে উরুদ্বয় থেকে তার উৎপত্তি এবং শূদ্র অন্যদের সেবা করত বলে পদযুগল থেকে তার উৎপত্তি । তবে মনে হয় যে ঋকবৈদিক যুগে বর্ণবিভাগ পুরুষানুক্রমিক হয় নি । একই পরিবারের লােক যে ভিন্ন ভিন্ন কাজে নিযুক্ত থাকত ঋকবেদে তার উল্লেখ দেখা যায় । পিতা স্তোত্রকার , পুত্র চিকিৎসার এবং কন্যা যব চূর্ণ করে এমন একটি পরিবারের কথা সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে । সম্ভবত যে যুগে বিভিন্ন বর্ণের মানুষের মধ্যে বিবাহ প্রথাও নিষিদ্ধ ছিল না । 
ব্ৰত্মচর্য ,গার্হস্থ্য , বানপ্রস্থ ও যতি বা সন্ন্যাস চতুরাশ্রম নামে পরিচিত ব্রাত্মণ , ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই তিন বর্ণের প্রত্যেকটি পুরুষের জীবনকে চারভাগে বা পর্যায়ে বিভক্ত করার পদ্ধতি ঋকবৈদিক যুগেই প্রচলিত হয় । চতুরাশ্রমের নিয়ম অনুযায়ী সমাজের উচ্চ তিন শ্রেণীর আর্যগণ বাল্যে ব্ৰত্মচর্য পালন করে গুরুগৃহে শাস্ত্রশিক্ষা করত , যৌবনে গার্হস্থ্য বা বিবাহাদি করে সৎভাবে সংসারধর্মী পালন , প্রৌঢ়বয়সে বানপ্রস্থ বা সংসার ত্যাগ করে বনে কুটিরে বাস করে ধর্মাচরণ করত এবং শেষ বয়সে সুন্ন্যাস বা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করত ।


( 8 ) আমােদ প্রমােদ : ঋকবেদে কয়েক ধরনের ক্রীড়া ও আমােদ প্রমােদের উল্লেখ পাওয়া যায় । ঘােড়াদৌড় , রথদৌড় , পাশাখেলা , সঙ্গীত , মৃগয়া বা শিকার প্রভৃতির প্রচলন ছিল । তবে মদ্যপান , দূতক্রীড়া প্রভৃতি নিন্দনীয় ছিল । স্ত্রীলােকদের মধ্যে সাধারণ শিক্ষা ছাড়াও নৃত্যগীত প্রভৃতির চর্চা প্রচলিত ছিল ।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন