শনিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২২

আর্যজাতির ভারতে আগমন : বৈদিক সভ্যতা অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

Clg history questions answers কলেজ ইতিহাস প্রশ্নোত্তর আর্যজাতির ভারতে আগমন  বৈদিক সভ্যতা অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর arjojatir bharate agomon boidik sovyota

প্রশ্ন । আর্যদের আদি বাসস্থান কোথায় ছিল ? ভারতে প্রবেশ করে কোথায় তারা প্রথম বসতি স্থাপন করে ।

উত্তর : সম্ভবত যিশু খ্রিস্টের জন্মের দেড়হাজার বছর পূর্বে আর্যগণ ভারতে প্রবেশ করে । আর্যদের পূর্ব বাসস্থান সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে । মধ্য এশিয়া , উত্তর মেরুপ্রদেশ দক্ষিণ রাশিয়া প্রভৃতি অঞল তাদের আদি বাসস্থান বলে অনুমান করা হয় । কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় আর্যগণ যে প্রাচীনকালে বাস করত তার কিছু কিছু নিদর্শন তখনও দেখতে পাওয়া যায় । পরবর্তীকালে বংশবৃদ্ধি , গৃহপালিত পশুর খাদ্যাভাব ও নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ দেখা দিলে তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে ইয়ােরােপের বিভিন্ন অঞ্চল এবং পারস্য ও ভারতে প্রবেশ করে । ভারতে প্রবেশ করে তারা সপ্তসিন্ধু অঞলে অর্থাৎ সিন্ধু নদ এবং তার শাখানদীদের দ্বারা বিধৌত অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে । 



প্রশ্ন । সপ্তসিন্ধু কাকে বলে ? 

উত্তর : আর্যরা ভারতে প্রবেশ করে প্রথমে সিন্ধুনদের উপত্যকা অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে । বৈদিক সাহিত্যে এই অঞ্চল ‘সপ্তসিন্ধু’ বা ‘সপ্তসিন্ধব’ অর্থাৎ সাতটা নদীর অঞ্চল বলে উল্লিখিত আছে । এই নদীগুলাে হল বিতস্তা , চন্দ্রভাগা , ইরাবতী , বিপাশা , শতদ্রু , সরস্বতী ও সিন্ধু । 


প্রশ্ন । চতুরাশ্রম কি ? 

উত্তর : আর্যদের সামাজিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল চতুরাশ্রম । এই চারটি আশ্রমের নাম ব্ৰত্মচর্য, , বাণপ্রস্থ ও সন্ন্যাস । ব্ৰত্মচর্য আশ্রমে ব্রাত্মণ , ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যরা বাল্যকালে গার্হস্থ্য গুরুগৃহে বাস করে ব্রক্ষ্মচর্য পালনের সঙ্গে সঙ্গে শাস্ত্রশিক্ষা করত । শাস্ত্রশিক্ষা শেষ হলে জীবনের দ্বিতীয় গার্হস্থ্য আশ্রম শুরু হত । তারপর বিবাহাদি করে আদর্শভাবে সংসার জীবন যাপন করতে হত । বাণপ্রস্থ আশ্রমের সময় তারা সংসার ত্যাগ করে তপস্বীর জীবন যাপন করত । সন্ন্যাস আশ্রমে তারা সংসারের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে একমাত্র মুক্তির অপেক্ষায় জীবনের বাকি দিনগুলাে কাটাত । 


প্রশ্ন । আর্যধর্মের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ কর । 

উত্তর : আর্যদের ধর্মের প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য হল — বহুদেব -দেবীর উপাসনা প্রচলিত থাকলেও মূলত আর্যগণ ঈশ্বর এক এই ধারণায় বিশ্বাস করত এবং বৈদিক যুগের প্রথম দিকে মূর্তিপূজা প্রচলিত ছিল না । অগ্নি জ্বেলে দেবতাদের উদ্দেশ্যে মৃত , সােমরস প্রভৃতি আহুতি দিয়ে যজ্ঞ করা এবং দেবতাদের উদ্দেশ্যে শুধু স্তোত্র পাঠ করাই ছিল তাদের উপাসনার পদ্ধতি । 



প্রশ্ন । আর্যদের প্রাচীন সাহিত্য সম্পর্কে কি জান ? 

উত্তর : আর্যদের প্রাচীনতম সাহিত্য ও ধর্মগ্রন্থ বেদ । বেদ শব্দের অর্থ জ্ঞান । আর্যগণ বেদকে ঈশ্বরের বাণী বলে মনে করতেন । বেদ প্রথম দিকে লিপিবদ্ধ হয়নি — তা মুখে প্রচলিত ছিল । এজন্য বেদের অপর নাম শুতি । বেদ চারিভাগে বিভক্ত, যথা — ঋক , সাম , যজু ও অথর্ব । ঋকবেদ মন্ত্রপ্রধান সামবেদ সঙ্গীত প্রধান , যজু বেদে যজ্ঞানুষ্ঠানের রীতিনীতি এবং অথর্ববেদে সৃষ্টি রহস্য , চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্বন্ধে আলােচনা করা হয়েছে । প্রতিটি বেদের আবার চারিটি ভাগ — সংহিতা , ব্রাত্মণ , আরণ্যক ও উপনিষদ । সংহিতায় যাগযজ্ঞের মন্ত্রতন্ত্র , ব্ৰাত্মণেযাগ যজ্ঞের নিয়ম - কানুন, আরণ্যকে সন্ন্যাস ধর্মের ও উপনিষদে গভীর দার্শনিক তত্ত্বের আলােচনা পাওয়া  যায় । উপনিষদ বৈদিক সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনা । উপনিষদকে বেদান্তও বলা হয় । 


প্রশ্ন । বিশপতি কে ? 

উত্তর : বৈদিক যুগে কয়েকটি গ্রামের সমন্বয়ে একটি ‘বিশ’ বা ‘জন’ গঠিত হত । ‘বিশ’ বা ‘জন’- এর সর্বোচ্চশাসক ছিলেন ‘বিশপতি’ বা ‘রাজন’ অর্থাৎ রাজা ।

     
প্রশ্ন । নিষ্ক কাকে বলে ? 

উত্তর : বৈদিক যুগের প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রার নাম ছিল নিষ্ক । 


প্রশ্ন । বৈদিক যুগে ‘সভা’ ও ‘সমিতির’ কাজ কি ছিল ? 

উত্তর : বৈদিক যুগে রাজাকে শাসনকার্যে সাহায্যে করা ও পরামর্শ দানের জন্য যে দুটি জন প্রতিনিধিমূলক সংস্থা গড়ে ওঠে তার একটির নাম ‘সভা’ অপরটির নাম ‘সমিতি’ । রাজ্যের বয়স্ক ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে সভা এবং জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সমিতি গঠিত হত । 


প্রশ্ন । সর্বাপেক্ষাপ্রাচীনবেদের নাম কি ? 

উত্তর : প্রাচীনতম বেদের নাম ঋকবেদ । 



প্রশ্ন । ঋকবেদের যুগে রাজার ক্ষমতা ও দায়িত্ব কি ছিল ?  

উত্তর : বৈদিক যুগে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকলেও আর্যদের মধ্যে প্রধাণত রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল । রাজপদ সাধারণত বংশানুক্রমিক ছিল তবে কোন কোন ক্ষেত্রে প্রজাবর্গ কতৃক রাজা নির্বাচিত হতেন । রাজা দৈবস্বত্বের অধিকারী ছিলেন না । তাঁর স্বৈরাচারী হওয়ারও কোন সুযােগ ছিল না । ‘সভা’ ও ‘সমিতি’ নামে দুটি জনপ্রতিনিধি মূলক সভার সঙ্গে পরামর্শ করে তাঁকে তা করতে হত । বহিঃশত্রুর হাত থেকে রাজ্যকে রক্ষা করা , প্রয়ােজনে যুদ্ধ পরিচালনা করা , রাজ্যের মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা , বিচারকার্য পরিচালনা প্রভৃতি রাজার প্রধান দায়িত্ব বলে বিবেচিত হত । 



প্রশ্ন । ঋকবেদের যুগের দুটি প্রতিনিধি সভার নাম কর । 

উত্তর : ঋকবৈদিক যুগে রাজাকে শাসনকার্য পরিচালনার সাহায্য করার জন্য সভা ও সমিতি নামে দুটি জনপ্রতিনিধি মূলক সভার সাহায্য গ্রহণ করতে হত । রাজ্যের বয়স্ক ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে সভা গঠিত হত এবং সমিতি গঠিত হত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে । সাধারণত জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজাকে এই দুটি জনপ্রতিনিধি সভার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হত । এই ভাবে রাজার স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা হত । তবে পরবর্তী কালে রাজ্যগুলাের আয়তন বৃদ্ধির ফলে এই সংস্থা দুটির গুরুত্ব হ্রাস পায় । 


প্রশ্ন । ঋকবৈদিক যুগে নারীর সামাজিক মর্যাদা কিরুপ ছিল ?

উত্তর : ঋকবৈদিক যুগে আর্যরা পুত্রসন্তানের জন্ম কামনা করলেও সমাজে নারী বিশেষ মর্যাদার অধিকারিনী ছিলেন । তাঁরা ছিলেন গৃহের সর্বময়কত্রী ও যথার্থ অর্থেই পুরুষের সহধর্মিনী । পণপ্রথা সে যুগে প্রচলিত ছিল না । বয়ঃপ্রাপ্ত ও পুরুষ নারী সাধারণত পরস্পরকে মনােনীত করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতেন । বিধবা নারীর পূণর্বিবাহের অধিকার ছিল । অনেক ক্ষেত্রে পাত্রপক্ষকে কন্যাপণ দিতে হত । 



প্রশ্ন । পরবর্তী বৈদিক যুগে রাজার ক্ষমতাও দায়িত্বের ক্ষেত্রে কি কি পরিবর্তন ঘটে ? 

উত্তর : পরবর্তী বৈদিক যুগে বৃহদায়তন রাজ্যের উৎপত্তি হওয়ায় রাজার ক্ষমতা মর্যাদা এবং প্রতিপত্তি যথেষ্ঠ বৃদ্ধি পায় । ‘রাজন’ উপাধির পরিবর্তে রাজারা একরাট , বিরাট , সম্রাট সার্বভৌম প্রভৃতি উপাধি গ্রহণ করতে থাকেন । এই যুগে ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতায় বিশ্বাসী রাজতন্ত্রের উদ্ভব ঘটে এবং প্রচার করা হতে থাকে যে রাজাই সর্বেসর্বা এবং সকল ক্ষমতার উৎস স্বরুপ । তিনি অভ্রান্ত এবং সকল শক্তির ঊর্ধ্বে । রাজশক্তির নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘সভা’ ও সমিতি তাদের পূর্বেকার ক্ষমতা অনেকাংশে হারিয়ে ফেলে । তবে পূর্ববর্তী যুগের মতাে এই যুগেও রাজ্যরক্ষা প্রজাপালন , শাসন , পরিচালনা ও যুদ্ধপরিচালনার দায়িত্ব রাজাকেই পালন করতে হত ।

 
প্রশ্ন । বৈদিক যুগে ক্ষেত্রে রচনা করতেন এমন চারজন নারীর নাম কর ।

উত্তর : বিশ্ববারা, লােপামুদ্রা, পৌলমী , ঘােষা প্রভৃতি বিদুষী নারীরা বেদের স্তোত্র রচনা করতেন । 

প্রশ্ন । বৈদিক যুগের পরিবারের প্রধানকে কি বলা হত ? 

উত্তর : বৈদিক যুগে পরিবারের প্রধানকে গৃহপতি বা দম্পতি বলা হত । 


প্রশ্ন । দাস এবং দস্যু কাদের বলা হত ? 

উত্তর : আর্যদের ভারতে প্রবেশ করার পূর্বে অনার্যজাতির যে সব যে সব লােক ভারতে বাস করত তাদের দাস ও দস্যু নামে অভিহিত করা হত । 





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন